প্রতিবেশীর হক : সচেতনতা প্রয়োজন

 প্রতিবেশীর হক : সচেতনতা প্রয়োজন

মাওলানা মুহাম্মাদ ফজলুল বারী

প্রতিবেশী। মানবসমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ফলে ইসলামে প্রতিবেশীর হককে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনজিবরীল (.) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি তাকিদ করেছেন যেআমার কাছে মনে হয়েছে প্রতিবেশীকে মিরাছের অংশিদার বানিয়ে দেয়া হবে। (দ্র.সহীহ বুখারী ৬০১৪;সহীহ মুসলিম ২৫২৪কিন্তু আজকাল  বিষয়ে আমাদের মাঝে চরম অবহেলা পারিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে গ্রামের মানুষের মাঝে। বছরের পর বছর পার হয় পাশের বাড়ির কারো সাথে কোনো কথা হয় নাখোঁজ খবর নেওয়া হয় নাবরং বিভিন্নভাবে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া হয়। অথচ প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ  তাকে কষ্ট না দেওয়াকে ঈমানের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনযে আল্লাহ  আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করে। (সহীহ মুসলিমহাদীস : ১৮৫আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনযে আল্লাহ  আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। (সহীহ মুসলিমহাদীস : ১৮৩)

প্রতিবেশী কে?

প্রতিবেশী বলতে মুসলিমকাফেরনেক বান্দা,ফাসেকবন্ধুশত্রু,পরদেশীস্বদেশীউপকারীক্ষতিসাধনকারীআত্মীয়অনাত্মীয়নিকটতম বা তুলনামূলক একটু দূরের প্রতিবেশী সবাই অন্তর্ভুক্ত।

আর প্রতিবেশী সাধারণত তিন শ্রেণীর হয়ে থাকে এবং তাদের হকও বিভিন্ন দিকে লক্ষ করে কম বেশী হয়ে থাকে। যার এক দিক থেকে হক থাকে। সে হলঅনাত্মীয় বিধর্মী প্রতিবেশী।  ব্যক্তির হক শুধু প্রতিবেশী হওয়ার ভিত্তিতে।  যার দুই দিক থেকে হক থাকে। সে হলমুসলিম প্রতিবেশীযার সাথে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই।  ব্যক্তির হক প্রতিবেশী এবং মুসলিম হওয়ার দিক থেকে। যার তিন দিক থেকে হক থাকে। সে হলমুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী।  ব্যক্তির হক প্রতিবেশীমুসলিম  আত্মীয় হওয়ার দিক থেকে। তবে প্রত্যেক শ্রেণীই যেহেতু প্রতিবেশী তাই প্রতিবেশীর সকল হকের ক্ষেত্রে সবাই সমান হকদার। আর প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখাবিপদে আপদে এগিয়ে যাওয়াএকে অপরের সুখ-দুঃখের শরিক হওয়াহাদিয়া আদান প্রদান করাসেবা শুশ্রূষা করাপ্রতিবেশীর কেউ মারা গেলে সান্ত্বনা দেওয়াকাফন দাফনে শরিক হওয়াএকে অপরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়াপ্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়াপ্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হয় এমন সব ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি সবই একজন মুমিনের স্বভাবজাত বিষয় হওয়া উচিত।

প্রতিবেশীর হক কুরআনে

আল্লাহ তাআলা আলকুরআনুল কারীমে সূরা নিসার ৩৬ নং আয়াতে আল্লাহর ইবাদাত  তার সাথে কাউকে শরিক না করা-এই বিধানের সাথে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের হক। তার মধ্যে রয়েছে মাতা পিতার হকআত্মীয় স্বজনের হকএতীমের হক ইত্যাদি। এসব গুরুত্বপূর্ণ হকের সাথেই আল্লাহ প্রতিবেশীর হককে উল্লেখ করেছেন।  থেকেই বোঝা যায়প্রতিবেশীর হককে আল্লাহ কত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তা রক্ষা করা আমাদের জন্য কত জরুরি। আল্লাহ বলেছেন, (অর্থতোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং কোনো কিছুকে তার সাথে শরিক করো না। এবং পিতা-মাতাআত্মীয়-স্বজনএতীমঅভাবগ্রস্থনিকট-প্রতিবেশীদূর-প্রতিবেশীসংগী-সাথীমুসাফির  তোমাদের দাস-দাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। 

উত্তম প্রতিবেশী কে?

 প্রশ্নের সহজ উত্তর হলযে প্রতিবেশীর সাথে ভালো আচরণ করে এবং প্রতিবেশীর সকল হক যথাযথভাবে আদায় করে। ফলে প্রতিবেশী তার উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং আল্লাহ্ও তার উপর সন্তুষ্ট থাকেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ... যে স্বীয় প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে ভালো সেই সর্বোত্তম প্রতিবেশী। (সহীহ ইবনে খুযাইমা হা২৫৩৯শুআবুল ঈমান বায়হাকীহা৯৫৪১মুসনাদে আহমদ হা৬৫৬৬)

প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখা ঈমানের দাবি

হযরত ইবনে আববাস রাথেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ব্যক্তি মুমিন নয় যে পেটপুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে। (মুসনাদে আবু ইয়ালাহাদীস ২৬৯৯আল আদাবুল মুফরাদহাদীস ১১২)

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়অনেক প্রতিবেশীই এমন আছেযাদের দেখে বোঝার উপায় নেই যেতারা অভাবে দিন কাটাচ্ছে। আবার  আমার কাছে কখনো চাইবেও না।  কুরআন মাজীদে এদেরকে ‘মাহরূম’ বলা হয়েছেসূরা যারিয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,(অর্থএবং তাদের সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত  মাহরূমের (বঞ্চিতেরহক। (সূরা যারিয়াত : ১৯এক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্যনিজে থেকে তাদের খোঁজ খবর রাখা এবং দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন পন্থা অবলম্বন করাযাতে সে লজ্জা না পায়। এজন্যইতো যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে এটা বলে দেয়া জরুরি নয় যেআমি তোমাকে যাকাত দিচ্ছিবরং ব্যক্তি যাকাতের যোগ্য কি না এটুকু জেনে নেয়াই যথেষ্ট। 

আর আমি প্রতিবেশীর প্রয়োজন পুরা করব তাহলে আল্লাহ আমার প্রয়োজন মিটিয়ে দিবেন এবং আমার সহায় হবেন। হাদীস শরীফে এসেছেযে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পুরা করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পুরা করেন। (সহীহ বুখারী,হাদীস ২৪৪২সহীহ মুসলিমহাদীস ২৫৮০) &

 

প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ

প্রতিবেশী আমার জীবনের আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। তার সাথে আমার আচরণ সুন্দর হবে তা কি বলে বোঝাতে হয়আর আমি যদি মুমিন হই তাহলে তো তা আমার ঈমানের দাবি। হযরত আবু শুরাইহ্ রাবলেনআমার দুই কান শ্রবণ করেছে এবং আমার দুই চক্ষু প্রত্যক্ষ করেছে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনযে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং আখেরাতে বিশ্বাস রাখে সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীকে সম্মান করে। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আছে ‘সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করে।

(সহীহ বুখারীহাদীস ৬০১৮সহীহ মুসলিমহাদীস ৪৮)

হাদিয়া আদান-প্রদান

প্রতিবেশীদের পরস্পরের সুসম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে হাদিয়ার আদান-প্রদান খুবই কার্যকর পন্থা। এর মাধ্যমে হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়  ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা হাদিয়া আদান-প্রদান কর। এর মাধ্যমে তোমাদের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি হবে।’ (দ্রআল আদাবুল মুফরাদ,বুখারী হাদীস : ৫৯৪)

তরকারির ঝোল বাড়িয়ে দাও

প্রতিবেশীকে শরীক কর

এক প্রতিবেশী আরেক প্রতিবেশীকে হাদিয়া দেওয়ার বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ যেসামান্য জিনিস হাদিয়া দিতেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। এক  হাদীসে আছেআল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু যর রা.- কে বলেনহে আবু যরতুমি ঝোল (তরকারিরান্না করলে তার ঝোল বাড়িয়ে দিও এবং তোমার প্রতিবেশীকে তাতে শরিক করো। (সহীহ মুসলিম,হাদীস ২৬২৫)

অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদেরকে  বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে বলেছেনহে মুসলিম নারীগণতোমাদের কেউ যেন প্রতিবেশীকে হাদিয়া দিতে সংকোচবোধ না করে। যদিও তা বকরীর খুরের মত একটি নগন্য বস্ত্তও হয়। (দ্রসহীহ বুখারী ৬০১৭)

সুতরাং প্রতিবেশী নারীরাও নিজেদের মাঝে হাদিয়া আদান-প্রদান করবেন।

ভালো কিছু রান্না হলে...

আমার বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে প্রতিবেশীকে না জানালেও রান্নার ঘ্রাণ তো তাকে জানিয়ে দেয়পাশের বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হচ্ছে। বড়দের কথা বাদ দিলামঘ্রাণ পেয়ে ছোটদের মনে তো আগ্রহ জাগবে তা খাওয়ার। সুতরাং তাদের দিকে লক্ষ্য রেখে ঝোল বাড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে হোক বা নিজে একটু কম খাওয়ার মাধ্যমে হোক সামান্য কিছু যদি পাঠিয়ে দিই তাহলে  ছোট্ট শিশুর মনের ইচ্ছা যেমন পুরা করা হবে তেমনি আল্লাহও খুশি হবেন। যা আমার রিযিকে বরকতের কারণ হবে ইনশাআল্লাহ। যে খাদেম খানা  তৈরি করল তাকেও খানায় শরিক করার কথা হাদীসে এসেছে। কারণ  খাবার প্রস্ত্তত করতে গিয়ে সে এর ধোঁয়া যেমন সহ্য করেছে তেমনি এর সুঘ্রাণও তার নাকে  মনে লেগেছে। সুতরাং... রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনতোমাদের খাদেম যখন তোমাদের জন্য খানা প্রস্ত্তত করে নিয়ে আসে তখন তাকে যদি সাথে বসিয়ে খাওয়াতে না- পার তাকে দু এক লোকমা হলেও দাও। (সামান্য কিছু দিয়ে হলেও তাকে এই খানায় শরিক করকারণসে- তো এই খানা প্রস্ত্তত করার কষ্ট  আগুনের তাপ সহ্য করেছে। (সহীহ বুখারীহাদীস ৫৪৬০)

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়,ভালো কিছু রান্না হলে মাঝে মধ্যে কাজের বুয়ার সন্তানদের জন্য কিছু দেয়া উচিত। অনেক সময় খাবার বেঁচে যায়। হতে পারে আমার ঘরের  বেঁচে যাওয়া খাবারই কাজের বুয়ার সন্তানদের জন্য হবে ‘ঈদের খাবার আর আশা করা যায় এর বিনিময়ে আল্লাহ আমার জন্য জান্নাতের মেহমানদারির ফয়সালা করবেন।

প্রতিবেশী যদি দরিদ্র হয়

আর প্রতিবেশী যদি দরিদ্র হয় তাহলে  বিষয়ে তার হক আরো বেশি। কারণ দরিদ্রকে খানা খাওয়ানো যেমন অনেক সওয়াবের কাজ তেমনি দরিদ্রকে খানা না-খাওয়ানো জাহান্নামে যাওয়ার একটি বড় কারণ। কুরআন মজীদে ‘ছাকার’ নামক জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে নামায না পড়ার বিষয়টির সাথে সাথে দরিদ্রকে খানা না খাওয়ানোও গুরুত্বসহকারে উল্লেখিত হয়েছে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, (জাহান্নামীকে জিজ্ঞেস করা হবে) (অর্থকোন বিষয়টি তোমাদেরকে ‘ছাকার’ নামক জাহান্নামে ঠেলে দিয়েছে? (তারা উত্তরে বলবেআমরা নামায পড়তাম না এবং দরিদ্রকে খানা খাওয়াতাম না। (সূরা মুদ্দাছ্ছির ৪২-৪৪)

নিকটতম প্রতিবেশীকে আগে হাদিয়া দিবযদিও সে বিধর্মী হয়

প্রতিবেশীর মধ্যে যেমন আছে নিকট প্রতিবেশীনিকটতম প্রতিবেশী  তুলনামূলক একটু দূরের প্রতিবেশী তেমনি আছে মুসলিম  বিধর্মী। এখন কাকে হাদিয়া দিব বা কাকে আগে দিবহযরত আয়েশা রাবলেনআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম-আমার দুই প্রতিবেশী। এদের কাকে হাদিয়া দিবরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনযে তোমার বেশি নিকটবর্তী। (সহীহ বুখারী,

হাদীস ৬০২০)

মুজাহিদ রহবলেনএকবার আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র রা.-এর কাছে ছিলাম। তার গোলাম একটি বকরীর চামড়া ছাড়াচ্ছিল। তখন তিনি বললেনতোমার  কাজ শেষ হলে সর্বপ্রথম আমাদের ইহুদী প্রতিবেশীকে দিবে। তখন এক ব্যক্তি বললআল্লাহ আপনার এসলাহ করুন। আপনি ইহুদীকে আগে দিতে বলছেনতখন তিনি বললেন, (হাঁআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রতিবেশীর হকের বিষয়টি এত বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলতে শুনেছি যেআমাদের আশংকা হয়েছে বা মনে হয়েছেপ্রতিবেশীকে মিরাছের হকদার বানিয়ে দেয়া হবে। (আল আদাবুল মুফরাদবুখারী,হাদীস ১২৮শরহু মুশকিলিল আছারতহাবী,হাদীস ২৭৯২)

প্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিব

অনেক সময় এমন হয়প্রতিবেশীর প্রয়োজনে কিছু ছাড় দিতে হয়। কিংবা নিজের কিছু ক্ষতি স্বীকার করলে প্রতিবেশীর অনেক বড় উপকার হয় বা সে অনেক বড় সমস্যা থেকে বেঁচে যায়। তেমনি একটি বিষয় হাদীস শরীফে উদ্ধৃত হয়েছেযা মুমিনকে  বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনকোনো প্রতিবেশী যেন অপর প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে কাঠ স্থাপন করতে বাধা না দেয়। (সহীহ বুখারী,হাদীস ২৪৬৩সহীহ মুসলিম,হাদীস ১৬০৯)

আরেক হাদীসে এসেছেযে তার (মুসলিমভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে স্বয়ং আল্লাহ তার প্রয়োজন পুরা করেন। (সহীহ মুসলিম,হাদীস ২৫৮০)

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আদান প্রদান

আমাদের প্রায় সকলেরই সূরা মাউন মুখস্থ আছে। ‘মাউন’ অর্থ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের ছোট খাট অনেক জিনিসেরই প্রয়োজন হয়। কোনো বস্ত্ত হয়তো সামান্যকিন্তু তার প্রয়োজন নিত্য। যেমন লবন। খুবই সামান্য জিনিসকিন্তু তা ছাড়া আমাদের চলে না। কখনও এমনও হয় দশ টাকার লবন কেনার জন্য বিশ টাকা রিক্সা ভাড়া খরচ করতে হবে বা এখন এমন সময় যে তা পাওয়া যাবে না। অথচ লবন না হলে চলবেই না। তখন আমরা পাশের বাড়ি বা প্রতিবেশীর দ্বারস্থ হই। এমন সময়  সাধারণ বস্ত্তটি যদি কেউ না দেয় তাহলে নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হয়ে যাবে। কোনো প্রতিবেশী যদি এমন হয় তাহলে তাকে ধিক শত ধিক। আল্লাহও তাকে ভৎর্সনা দিয়েছেন। সূরা মাউনে আল্লাহ বলেছেন, (অর্থসুতরাং দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদেরযারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীনযারা লোক দেখানোর জন্য তা করেএবং গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট-খাট সাহায্যদানে বিরত থাকে। (সূরা মাউন-)

হক্কে শুফ্আ

এটি প্রতিবেশীর গুরুত্বপূর্ণ একটি হক। নিজের জমি বা বাড়ি যদি কেউ বিক্রি করতে চায় তাহলে সে ব্যাপারে পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীর হক সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ তাকে আগে জানাতে হবে যেআমি আমার বাড়ি বা জমি বিক্রি করতে চাই তুমি তা কিনবে কি না। যদি সে কিনতে না চায় তাহলে অন্যের কাছে বিক্রি করা যাবে। তাকে না জানিয়ে কারো কাছে বিক্রি করা যাবে না। করলে সে দাবি করতে পারবে যেআমি এই জমি ক্রয় করব। এটা তার হক। কারণহতে পারে  জমিটি তার প্রয়োজন বা এমন ব্যক্তি তা ক্রয় করল যার কারণে সে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে ইত্যাদি। আর একেই শরীয়তের পরিভাষায় ‘হক্কে শুফ্আ’ বলে।

হাদীস শরীফে প্রতিবেশীর  হকটিকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনযদি কেউ তার জমি বিক্রি করতে চায় তাহলে সে যেন তার প্রতিবেশীকে জানায়। (সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস ২৪৯৩)

আরেক হাদীসে হযরত ইবনে আববাস রাথেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘শুফ্আ’- বিষয়ে প্রতিবেশীর হক সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেশি উপস্থিত না থাকলেও তার অপেক্ষা করতে হবে। এটা তখন যখন তাদের উভয়ের চলাচলের পথ এক হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহহা২৪৯৪জামে তিরমিযীহা১৩৬৯ ধরনের আরো অনেক হাদীসে হক্কে শুফ্আর বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।

মন্দ প্রতিবেশী থেকে আল্লাহ্র পানাহ

মন্দ প্রতিবেশী থেকে আমরা আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। কারণ একজন মন্দ প্রতিবেশী সাধারণ জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করবে বা আমাকেও মন্দের দিকে নিয়ে যাবে।  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা মন্দ প্রতিবেশী থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও।(দ্রসুনানে নাসায়ী,হাদীস ৫৫০২শুআবুল ঈমানবায়হাকী হা৯১০৬)

আমি হব না মন্দ প্রতিবেশী

আমি কারো জন্য মন্দ প্রতিবেশী হব না। যেমনিভাবে আমি চাই না যেআমার প্রতিবেশীটি মন্দ হোক তেমনিভাবে আমাকেও ভাবতে হবেআমিও যেন আমার প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ না হই। হযরত নাফে ইবনে  আব্দুল হারিস রাথেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনউত্তম প্রতিবেশী ব্যক্তির সৌভাগ্যের কারণ... (মুসনাদে আহমাদ,হাদীস ১৫৩৭২আল আদাবুল মুফরাদবুখারী,হাদীস ১১৬)

এক মন্দ প্রতিবেশীর ঘটনা

প্রতিবেশীর সাথে মানুষের সম্পর্ক সামান্য সময়ের নয়বরং সকাল-সন্ধ্যারাত-দিনমাস  বছরের বা সারা জীবনের।  প্রতিবেশী যদি মন্দ হয় তাহলে ভোগান্তির আর শেষ থাকে না। তেমনি এক মন্দ প্রতিবেশীর ঘটনা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত আবু হুরাইরা রাথেকে বর্ণিতএক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তার প্রতিবেশীর ব্যাপারে অভিযোগ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেনতুমি ছবর কর। এভাবে সে তিনবার আসার পর তৃতীয় বা চতুর্থ বারে নবীজী তাকে বললেনতোমার বাড়ির আসবাবপত্র রাস্তায় নিয়ে রাখ। সাহাবী তাই করলেন। মানুষ সেখান দিয়ে যচ্ছিল এবং  প্রতিবেশীকে অভিশাপ দিচ্ছিল। তখন  প্রতিবেশী নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে বললআল্লাহর রাসূলমানুষ আমাকে যা তা বলছে। নবীজী বললেনমানুষ তোমাকে কী বলছেসে বললমানুষ আমাকে লানত করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনতার আগেই আল্লাহ তোমাকে লানত করেছেন। সে বললআল্লাহর রাসূলআমি আর এমনটি করব না (প্রতিবেশীকে কষ্ট দিব না।) তারপর অভিযোগকারী নবীজীর দরবারে এলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেনতুমি (প্রতিবেশীর অনিষ্ট থেকেনিরাপদ হয়েছ। (আলমুসতাদরাক,হাকেমহাদীস ৭৩০৩আলমুজামুল কাবীর,তবারানীহাদীস ৩৫৬সহীহ ইবনে হিববানহাদীস ৫২০)

দুই নারীর দৃষ্টান্তকে জান্নাতী?

প্রতিবেশীর সাথে মন্দ আচরণ ব্যক্তির সব আমল বরবাদ করে দেয়। তাকে নিয়ে ফেলে জাহান্নামে। হযরত আবু হুরাইরা রাথেকে বর্ণিতএক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললএক নারীর ব্যাপারে প্রসিদ্ধসে বেশি বেশি (নফলনামায পড়েরোযা রাখেদুই হাতে দান করে। কিন্তু যবানের দ্বারা স্বীয় প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় (তার অবস্থা কী হবে?) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনসে জাহান্নামে যাবে। আরেক নারী বেশি (নফলনামাযও পড়ে নাখুব বেশি রোযাও রাখে না আবার তেমন দান সদকাও করে নাসামান্য দু-এক টুকরা পনির দান করে। তবে সে যবানের দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না (এই নারীর ব্যাপারে কী বলেন?) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনসে জান্নাতী। (মুসনাদে আহমাদহাদীস ৯৬৭৫আলআদাবুল মুফরাদবুখারীহাদীস ১১৯)

প্রতিবেশীর দোষ ঢেকে রাখব

পাশাপাশি থাকার কারণে একে আপরের ভালো মন্দ কিছু জানাজানি হয়ই। গোপন করতে চাইলেও অনেক কিছু গোপন করা যায় না। প্রতিবেশীর এসকল বিষয় পরস্পরের জন্য আমানত। নিজের দুনিয়া  আখিরাতের কল্যাণেই একে অপরের দোষ ঢেকে রাখা জরুরি। আমি যদি তার দোষ প্রকাশ করে দিই তাহলে সেও আমার দোষ প্রকাশ করে দিবে। আর আমি যদি তার দোষ ঢেকে রাখি তাহলে সেও আমার দোষ গোপন রাখবে। এমনকি এর বদৌলতে আল্লাহও আমার এমন দোষ গোপন রাখবেনযা প্রতিবেশীও জানে না। হাদীস শরীফে এসেছেযে তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ঢেকে রাখে  আল্লাহও কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। (সহীহ মুসলিমহাদীস ২৫৮০)

মুসলিম  আত্মীয় হিসেবে প্রতিবেশীর হক

প্রতিবেশীর যত হক উপরে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো তো প্রতিবেশী মুসলিম হোক অমুসলিম হোক সবারই হক। আর প্রতিবেশী যদি মুসলিম হয় বা মুসলিম  আত্মীয় উভয়টিই হয় তাহলে এসকল হকের সাথে মুসলিম  আত্মীয় হিসেবে যত হক আছে সবই তাদের প্রাপ্য।  বিষয়টিও স্মরণ রাখা জরুরি।

আল্লাহ আমাদের প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে সচেতন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

Name art for facebook instgram reels